
চৌধুরী মাশকুর সালাম: বাংলাদেশের সংকটময় সময়ে নেতৃত্বের প্রশ্নটি আবারও সামনে এসেছে। জাতি যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও সামাজিক বিভাজনের মধ্যে দুলছে—তখন একজন অভিজ্ঞ, আন্তর্জাতিকভাবে সম্মানিত নাগরিকের প্রতি আমাদের আচরণ নিয়ে কঠিন আত্মসমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়। প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরে যে মনোভাব সমাজে দেখা গেছে, তা কেবল একজন ব্যক্তিকে নয়—আমাদের জাতীয় চরিত্রকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের চ্যালেঞ্জ কোনো সাধারণ কাজ নয়। রাজনৈতিক অসহযোগিতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, অভ্যন্তরীণ বিরোধ, বহিরাগত চাপ—এ সবকিছু মোকাবিলা করতে হলে সাহস, সততা, এবং অসাধারণ ধৈর্যের প্রয়োজন। এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেই একটি প্রবীণ মানুষ—৮০-এর অধিক বয়সে—জাতীয় সংকট সামাল দিতে এগিয়ে এসেছিলেন। পরিস্থিতি সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, যাদের কাছে দেশপ্রেম, মেধা ও অভিজ্ঞতা অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা—তাদের একাংশই বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি, দেশে যে কোনো সংস্কার উদ্যোগের সামনে একদল সুবিধাভোগীর দেয়াল দাঁড়িয়ে যায়। বিচারপ্রক্রিয়া হোক, প্রশাসনিক সংস্কার হোক, বা অর্থনৈতিক স্বচ্ছতার প্রচেষ্টা—বাধা আসে সংগঠিত স্বার্থগোষ্ঠী থেকে। সমাজে এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে যোগ্য, সৎ, এবং দেশপ্রেমিক মানুষরা রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, গবেষক, শিক্ষক, তরুণ মেধাবীরা দেশ ছাড়েন কারণ এই সমাজ তাদের প্রাপ্য সম্মান দিতে জানে না।
জনগণের একটি অংশও প্রায়শই ভুল ধারণা, বিভ্রান্তি এবং আবেগের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে। যেখানে যুক্তির প্রয়োজন, সেখানে শোনা যায় অপমানসূচক শব্দ; যেখানে আলোচনার দরকার, সেখানে ছোড়া হয় কথার বোমা। ফলে নেতৃত্বদানকারী যে-কেউ, যতই সৎ হোক, বাধা ও অবমাননার সম্মুখীন হন।
একটি বিষয় স্পষ্ট—আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখনো পরিপক্ব নয়। আমরা পরস্পরকে বিশ্বাস করতে শিখিনি। তাই যে কেউ পরিবর্তন আনতে চাইলে তার বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়ায় বিভক্তির রাজনীতি, ব্যক্তিগত আক্রমণ, আর উদ্দেশ্যমূলক অপপ্রচার।
অথচ এই জাতি দুর্ভাগ্যক্রমে যুগের পর যুগ ধরে অপেক্ষা করেছে যোগ্য নেতৃত্বের জন্য—যে নেতৃত্ব জাতিকে নতুন পথ দেখাতে পারে। কিন্তু সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও আমরা সেই নেতৃত্বকে মূল্য দিতে ব্যর্থ হই। ইতিহাস সাক্ষী, সম্মান দেওয়ার অক্ষমতা জাতিকে কখনো এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে না।
আজ তাই প্রশ্ন একটাই—আমরা কি সত্যিই পরিবর্তন চাই, নাকি কেবল অভিযোগ করার অভ্যেসে বাঁচতে চাই?
দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে আমাদের সম্মিলিত সদিচ্ছার ওপর।
যারা অগ্রগতি ও সংস্কারের বিরোধিতা করে, যাদের হাতেই বারবার জাতির অগ্রযাত্রা থমকে যায়—তাদের ভূমিকা ইতিহাস কঠোরভাবে মূল্যায়ন করবে।
আর যারা ব্যক্তিগত স্বার্থ ভুলে দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করেন—তাদের ত্যাগ, সাহস, এবং দেশপ্রেম জাতি স্মরণে রাখবে। প্রফেসর ইউনূস সেই স্মরণীয়দের একজন—এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
এই মুহূর্তে আমাদের দরকার আত্মবিশ্লেষণ—
আমরা কি সেই জাতি, যারা জ্ঞান ও সততার মূল্য দিতে পারে?
নাকি আমরা এমন এক সমাজে পরিণত হচ্ছি, যেখানে মেধা অবমূল্যায়িত হয়, আর প্রতিবন্ধকতা পুরস্কৃত হয়?
ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে আমাদের আজকের আচরণ।
মুহুর্ত ২৪ | প্রজন্মের বার্তাবাহক
www.muhurto24.com
বিশ্বময় সবসময় সর্বশেষ খবর জানতে চোখ রাখুন।
সাহিত্য, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি, সংবাদ সহ যেকোন বিষয়ে লেখা পাঠাতে পারেন এই ই-মেইলে [email protected]
Muhurto24 মুহুর্ত ২৪ (অনলাইন নিউজ সার্ভিস) © ২০২১ - ২০২৪